Image

এমন হারের দায় কি শুধুই নাজমুল–লিটনদের?

৯৭ প্রতিবেদক:

প্রকাশ : 3 ঘন্টা আগেআপডেট: 4 মিনিট আগে
এমন হারের দায় কি শুধুই নাজমুল–লিটনদের?

এমন হারের দায় কি শুধুই নাজমুল–লিটনদের?

এমন হারের দায় কি শুধুই নাজমুল–লিটনদের?

 

মিরপুর টেস্টে বাংলাদেশের হারটা শুধু একটি স্কোরকার্ডের পরাজয় নয়, বরং বেশ কিছু প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে দেশের ক্রিকেটকে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ৮ উইকেটে হারের পর সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা হতে পারে—ব্যাটসম্যানরা ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু পুরো ম্যাচের দিকে তাকালে বোঝা যায়, দায়টা শুধু নাজমুল হোসেন শান্ত, লিটন দাস কিংবা অন্য ব্যাটসম্যানদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

দুই ইনিংসে বাংলাদেশের ২০ উইকেটের ১৬টিই নিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা। জোমেল ওয়ারিক্যান একাই নিয়েছেন ৯ উইকেট, আর অধিনায়ক রস্টন চেজ দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং ধস নামিয়েছেন। বিপরীতে বাংলাদেশের স্পিনাররা পেয়েছেন মাত্র ৮ উইকেট।

অর্থাৎ যে অস্ত্র দিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই অস্ত্রেই বাংলাদেশ নিজেরাই কুপোকাত হয়েছে।

স্পিনের বিপক্ষে দুর্বলতা, তবু স্পিন উইকেট কেন?

ম্যাচ শেষে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত নিজেই স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশের ব্যাটিং ইউনিট ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনারদের আরও ভালোভাবে সামলাতে পারত। তাঁর ভাষায়, কখনো বাংলাদেশ স্পিন ভালো খেলে, কখনো পেস—কিন্তু এই ম্যাচে নিজেদের ব্যাটিং সামর্থ্য অনুযায়ী আরও ভালো করার সুযোগ ছিল।

এখানেই বড় প্রশ্নটা।

যে দলের ব্যাটসম্যানদের স্পিনের বিপক্ষে দুর্বলতা পুরোনো সমস্যা, সেই দল কেন মিরপুরে এমন একটি উইকেট বেছে নিল, যেখানে স্পিনই ম্যাচের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে?

শান্ত অবশ্য বলেছেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুর্বলতা, নিজেদের শক্তি ও প্রতিপক্ষকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়—এসব বিবেচনা করেই উইকেট তৈরি করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল বলে তিনি মনে করেন না।

কিন্তু ফলাফল সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ দিয়েছে।

পরিকল্পনার অস্ত্র কেন প্রতিপক্ষের হাতে চলে গেল?

মিরপুরের উইকেট শেষ পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনারদের জন্য বাংলাদেশের চেয়ে বেশি কার্যকর হয়েছে। ক্রিকবাজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা গড়ে ৩.৫ ডিগ্রি টার্ন পেয়েছেন, যেখানে বাংলাদেশের স্পিনারদের গড় টার্ন ছিল ৩ ডিগ্রি।

অর্থাৎ স্পিনসহায়ক উইকেট বানানোর পরিকল্পনা থাকলেও নিজেদের স্পিনাররা সেই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেননি।

এমনকি দলের ভেতরের একজন সদস্যও প্রশ্ন তুলেছেন, এমন উইকেটে যদি বাংলাদেশের স্পিনাররাই বল ঘোরাতে না পারেন, তাহলে আর কোথায় পারবেন?

সমস্যাটা শুধু বল ঘোরানোয় নয়। বাংলাদেশের স্পিনাররা তুলনামূলক বেশি গতিতে বল করেছেন, আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা ধীরগতিতে বল করে বেশি টার্ন আদায় করেছেন—এমন ব্যাখ্যাও এসেছে টিম ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে।

প্রস্তুতির ঘাটতিও কম দায়ী নয়

মিরপুর টেস্টের আগে বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন ছিল।

টেস্ট শুরুর মাত্র দুই দিন আগে ঘরোয়া ক্রিকেটের ডোমেস্টিক থ্রি ট্রফির নিলাম আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে জাতীয় দলের একাধিক ক্রিকেটারের উপস্থিতি ছিল। আবার টেস্ট শুরুর তিন দিন আগে সকালে দলের অনুশীলনে ব্যাটিং কোচ হিসেবে কাজ করা মোহাম্মদ আশরাফুলকে সরিয়ে দেওয়া হয়; দায়িত্ব পান মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল আন্তর্জাতিক সূচির চাপ।

মিরপুর টেস্টের একাদশে থাকা ছয়জন ক্রিকেটার এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলেছেন। দেশে ফেরার পর পুরো দল একসঙ্গে প্রস্তুতির সুযোগ পেয়েছে অল্প সময়ের জন্য।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যস্ত সূচি এখন বাস্তবতা। কিন্তু কোন সিরিজকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে, সেই অগ্রাধিকার ঠিক করাটাই তো ক্রিকেট বোর্ড ও টিম ম্যানেজমেন্টের কাজ।

গুরুত্বপূর্ণ টেস্টের আগে বিশ্রাম কি দেওয়া যেত না?

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এই দুই টেস্ট বাংলাদেশের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা জিইয়ে রাখতে সিরিজের প্রতিটি পয়েন্টের গুরুত্ব ছিল।

তারপরও টেস্ট দলের গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারদের নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের ঠিক আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলা হয়েছে।

সমস্যা আরও বাড়িয়েছে সময়ের ব্যবধান। আরব আমিরাতের গরমে ম্যাচ খেলে দেশে ফিরেই কয়েক দিনের মধ্যে টেস্ট ক্রিকেটে নামতে হয়েছে ক্রিকেটারদের।

বিশ্রাম, মানসিক প্রস্তুতি ও টেস্টের জন্য আলাদা অনুশীলনের সুযোগ—সবকিছুই ছিল সীমিত।

প্রশ্ন তাই উঠবেই: সূচি যেহেতু বিসিবির হাতে ছিল, টেস্ট সিরিজকে অগ্রাধিকার দিয়ে কিছু ক্রিকেটারকে ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকে বিশ্রাম দেওয়া যেত না?

উইকেট নিয়ে শেষ মুহূর্তের দ্বিধা

মিরপুরের উইকেট নিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টের পরিকল্পনাও পুরোপুরি পরিষ্কার ছিল না—এমন প্রশ্ন উঠেছে ম্যাচের আগে থেকেই।

প্রথমে স্পোর্টিং উইকেটের কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত তা স্পিনবান্ধব হয়ে ওঠে। অথচ দলের ব্যাটিং প্রস্তুতি সেই কন্ডিশনের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়নি।

ম্যাচে সেটিই প্রকট হয়েছে।

প্রথম ইনিংসে ২৭২ রান করার পর শেষ সাত উইকেট মাত্র ৫১ রানে হারায় বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে আরও বড় ধস—১৪২ রানে অলআউট। দুই ইনিংস মিলিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা ১৬ উইকেট নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানরা বাংলাদেশের স্পিনারদের বিপক্ষে চতুর্থ ইনিংসে যথেষ্ট স্বাচ্ছন্দ্যে খেলেছেন।

নিজেদের শক্তি ভুলে যাওয়ার মূল্য

বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট গত এক বছরে যে উন্নতির পথ খুঁজে পেয়েছিল, তার বড় অংশই এসেছিল পেস বোলিংয়ের ওপর ভর করে।

স্পোর্টিং উইকেটে ব্যাটসম্যানরা লড়াই করার মতো রান করবেন, এরপর পেসাররা চাপ তৈরি করবেন—এই পরিকল্পনাতেই সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলো এসেছে।

পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠে জয়, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক সাফল্য—এসব ম্যাচে পেসারদের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু মিরপুরে এসে বাংলাদেশ যেন নিজেদের সেই শক্তির জায়গা থেকে সরে গেল।

আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, স্পিনবান্ধব উইকেট বানিয়েও সেই উইকেটে নিজেদের স্পিনারদের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যায়নি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা যেখানে ১৬ উইকেট নিয়েছেন, বাংলাদেশের স্পিনাররা সেখানে ৮টি।

স্পিন বাংলাদেশের পুরোনো দুর্বলতা

মিরপুরে গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা স্পিনারদের বলে ৮০ বার আউট হয়েছেন, পেসারদের বলে ৭৩ বার। ব্যবধান খুব বড় নয়, কিন্তু স্পিনের বিপক্ষে দীর্ঘদিনের অস্বস্তির বিষয়টি এখানেই স্পষ্ট।

অর্থাৎ সমস্যাটা নতুন নয়।

তারপরও নিজেদের দুর্বল জায়গাটিকেই ম্যাচের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র বানানোর সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন বাংলাদেশকেই খুঁজতে হবে।

শুধু ব্যাটসম্যানদের কাঠগড়ায় দাঁড় করালে ভুল হবে

অবশ্যই নাজমুল, লিটন, শাদমান, মুমিনুলদের ব্যাটিং নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। ১৪২ রানে অলআউট হয়ে ১৭০ রানের লক্ষ্য তৈরি করা কোনোভাবেই যথেষ্ট ছিল না।

শান্ত নিজেও বলেছেন, ১৭০ রান ছিল নিচু মানের লক্ষ্য এবং চতুর্থ ইনিংসে বাংলাদেশ ভালো বোলিং করতে পারেনি। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, ব্যাটসম্যানদের ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিন আরও ভালোভাবে খেলা উচিত ছিল।

কিন্তু সেখানেই আলোচনা থামিয়ে দিলে আসল সমস্যাটা ধরা পড়বে না।

কারণ ক্রিকেটে ফলাফল শুধু মাঠে ব্যাট-বলের লড়াইয়ে তৈরি হয় না। তার আগে তৈরি হয় পরিকল্পনা, সূচি, প্রস্তুতি, কন্ডিশন নির্বাচন এবং একাদশের সিদ্ধান্তে।

বড় সুযোগটা কি বাংলাদেশ নিজেই নষ্ট করল?

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজটি বাংলাদেশের জন্য ছিল টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের উন্নতির পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা।

সেই পরীক্ষার প্রথম ম্যাচেই বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়েছে।

ব্যাটসম্যানরা স্পিন সামলাতে পারেননি, বোলাররা স্পিন উইকেটের সুবিধা কাজে লাগাতে পারেননি, প্রস্তুতিতে ছিল ঘাটতি, সূচিতে ছিল প্রশ্ন, আর উইকেটের পরিকল্পনাতেও ছিল ঝুঁকি।

শেষ পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১৭০ রানের লক্ষ্য মাত্র ৩৫.১ ওভারে দুই উইকেট হারিয়ে পেরিয়ে গেছে। ব্র্যান্ডন কিং ৮১ রানে অপরাজিত ছিলেন, কাভেম হজ অপরাজিত ৩১। সিরিজে ১-০ এগিয়ে গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

তাই এই হারের দায় শুধু নাজমুল-লিটনদের নয়।

ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা ছিল ফলাফলের সবচেয়ে দৃশ্যমান কারণ। কিন্তু সেই ব্যর্থতার পেছনে যে প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের প্রশ্নগুলো রয়েছে—সেগুলোর উত্তরও বাংলাদেশ ক্রিকেটকে দিতে হবে।

কারণ টেস্ট ক্রিকেটে উন্নতি শুধু ভালো খেলোয়াড় দিয়ে হয় না। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও একটি দলের শক্তি।

মিরপুরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঘাটতিটা হয়তো সেখানেই।

Details Bottom
Details ad One
Details Two
Details Three