Image

হাতে ব্যালন ডি’অর, মাথায় ব্যবসার বুদ্ধি—যেভাবে দুই ভুবনের ‘রাজা’ হ্যারি কেইন

৯৭ প্রতিবেদক:

প্রকাশ : 6 ঘন্টা আগেআপডেট: 16 মিনিট আগে
হাতে ব্যালন ডি’অর, মাথায় ব্যবসার বুদ্ধি—যেভাবে দুই ভুবনের ‘রাজা’ হ্যারি কেইন

হাতে ব্যালন ডি’অর, মাথায় ব্যবসার বুদ্ধি—যেভাবে দুই ভুবনের ‘রাজা’ হ্যারি কেইন

হাতে ব্যালন ডি’অর, মাথায় ব্যবসার বুদ্ধি—যেভাবে দুই ভুবনের ‘রাজা’ হ্যারি কেইন

এক হাতে ব্যালন ডি’অর, অন্য হাতে ব্যবসার হিসাব। মাঠে গোলের পর গোল করে যেমন ইতিহাস লিখছেন হ্যারি কেইন, তেমনি মাঠের বাইরেও নিজের ভবিষ্যৎ আর্থিক সাম্রাজ্যের ভিত শক্ত করে ফেলেছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক।

২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর জিতে ২৫ বছর পর প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে এই পুরস্কার নিজের করে নিয়েছেন কেইন। ৩৩ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার পেছনে ফেলেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, লামিনে ইয়ামাল ও লিওনেল মেসিদের। শুধু ব্যালন ডি’অরই নয়, জিতেছেন গের্ড মুলার ট্রফিও—বর্ষসেরা পুরুষ স্ট্রাইকারের পুরস্কার।

২০২৫–২৬ মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখ ও ইংল্যান্ডের হয়ে ৬৫ ম্যাচে ৭৩ গোল করেছেন কেইন। বায়ার্নকে বুন্দেসলিগা ও ডিএফবি-পোকাল জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি ডিএফএল সুপারকাপও জিতেছেন তিনি।

কিন্তু কেইনের গল্প শুধু ফুটবল মাঠে থেমে নেই। বরং তাঁর ক্যারিয়ারের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো—ফুটবল থেকে পাওয়া অর্থকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা ও বিনিয়োগে কাজে লাগানো যায়, সেই পরিকল্পনা।

২১ বছর বয়সেই ব্যবসার ভিত্তি

কেইনের ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু হয় ক্যারিয়ারের বেশ শুরুর দিকেই। ২০১৪ সালের অক্টোবরে HK28 Limited প্রতিষ্ঠিত হয়। যুক্তরাজ্যের কোম্পানি রেজিস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হিসেবে কেইনের নাম রয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাঁর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয়েছে।

এই ব্যবসায়িক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ HK28—যা ‘The Harry Kane Company’ নামেও পরিচিত। এর মাধ্যমে কেইনের ফুটবল, বাণিজ্যিক, বিনোদন ও দাতব্য কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক পরিচালনা করা হয়।

কেইনের ব্যবসা পরিচালনায় তাঁর ভাই চার্লি কেইনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করেছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক।

আবাসন ব্যবসায়ও বড় বিনিয়োগ

ফুটবলের বাইরের কেইনের অন্যতম বড় ব্যবসায়িক ক্ষেত্র আবাসন। তাঁর Edward James Investments নামের প্রতিষ্ঠানে কেইন পরিচালক হিসেবে যুক্ত আছেন। কোম্পানিটি পরিবারের সঙ্গে পরিচালিত হয়।

২০২৬ সালের ব্যবসায়িক প্রতিবেদন অনুযায়ী, Edward James Investments-এর সম্পদের মূল্য প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই অঙ্ককে কেইনের ব্যক্তিগত সম্পদের মূল্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না; এটি কোম্পানির সম্পদের হিসাব।

অর্থাৎ ফুটবল থেকে উপার্জন করা অর্থকে শুধু বিলাসী জীবনযাপনে না খরচ করে সম্পদ তৈরির দিকেও নজর দিয়েছেন কেইন।

Seat Unique-এ বিনিয়োগ

কেইনের ব্যবসায়িক পোর্টফোলিওর আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাম Seat Unique। এটি প্রিমিয়াম স্পোর্টস ও বিনোদন ইভেন্টের টিকিট এবং হসপিটালিটি প্যাকেজ নিয়ে কাজ করে।

২০২৫ সালে Seat Unique-এ বিনিয়োগকারী হিসেবে যুক্ত হন কেইন। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি বড় অঙ্কের বিনিয়োগও পেয়েছে। ২০২৬ সালের একটি ব্যবসায়িক প্রতিবেদনে কোম্পানিটির ২ কোটি পাউন্ডের ফান্ডিং রাউন্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—কিছু প্রতিবেদনে Seat Unique-এর মূল্যায়ন নিয়ে বড় অঙ্কের দাবি থাকলেও নির্ভরযোগ্য সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে কেইনের ব্যক্তিগত বিনিয়োগের পরিমাণ বা কোম্পানিটির বর্তমান মোট বাজারমূল্য প্রকাশ করা হয়নি। তাই কেইনের অংশীদারির মূল্য নির্দিষ্ট করে বলা নিরাপদ নয়।

Skechers-এর সঙ্গে আজীবনের চুক্তি

কেইনের সবচেয়ে আলোচিত বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল Skechers-এর সঙ্গে চুক্তি।

২০২৩ সালে বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেওয়ার সময় নাইকি, অ্যাডিডাস বা পুমার মতো প্রতিষ্ঠিত ফুটবল বুট ব্র্যান্ডের বদলে Skechers-এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি, আজীবন চুক্তিতে যান কেইন। Skechers-এর নিজস্ব ঘোষণাতেও এই দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক অংশীদারত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

চুক্তিটির বিশেষত্ব শুধু এর মেয়াদে নয়। ব্যবসায়িক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাঠামোটিতে শুধু নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক নয়, দীর্ঘমেয়াদে ব্র্যান্ডের ফুটবল ব্যবসার সাফল্যের সঙ্গে কেইনের আয়কে যুক্ত করার বিষয়ও ছিল।

২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ের পর Skechers কেইনের ৭৩ গোলের মৌসুমকে সামনে রেখে বিশেষ ‘Mark of Greatness’ প্রচারণাও চালিয়েছে।

শুধু ফুটবল নয়, প্রযুক্তি-খাদ্য-পোশাকেও বিনিয়োগ

কেইনের বিনিয়োগের তালিকা আরও বড়।

তিনি STATSports-এর মতো স্পোর্টস-টেক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছেন। প্রতিষ্ঠানটি খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ও শারীরিক তথ্য বিশ্লেষণে ব্যবহৃত GPS প্রযুক্তি তৈরি করে।

এ ছাড়া স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্র্যান্ড Bio&Me, টেকসই স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড Reflo, জার্মান পোরিজ ব্র্যান্ড 3Bears এবং ফুটবল প্রশিক্ষণ ও বিনোদন প্রতিষ্ঠান TOCA Football-এর সঙ্গেও কেইনের বিনিয়োগের সম্পর্ক রয়েছে।

অর্থাৎ তাঁর ব্যবসায়িক পোর্টফোলিও শুধু ফুটবলকেন্দ্রিক নয়। খেলাধুলা, স্বাস্থ্য, খাবার, প্রযুক্তি, পোশাক ও বিনোদন—বিভিন্ন খাতেই ছড়িয়ে আছে তাঁর বিনিয়োগ।

মাঠের আয়ও কম নয়

কেইনের ব্যবসায়িক পরিকল্পনার পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি অবশ্যই তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ার থেকে আসা আয়।

বায়ার্ন মিউনিখে তাঁর চুক্তির বেতন নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বড় অঙ্কের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৬ সালের একটি ব্যবসায়িক প্রতিবেদনে তাঁর সাপ্তাহিক আয় প্রায় ৪ লাখ পাউন্ড বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ক্লাবের পক্ষ থেকে খেলোয়াড়দের সুনির্দিষ্ট বেতন সাধারণত প্রকাশ করা হয় না, তাই এটিকে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন হিসেবেই দেখা উচিত।

এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে স্পনসরশিপ ও বাণিজ্যিক চুক্তি। ফলে ফুটবল মাঠে তাঁর সাফল্য যত বাড়ছে, মাঠের বাইরের ব্যবসায়িক সুযোগও তত বিস্তৃত হচ্ছে।

পরিবারই তাঁর ব্যবসার অন্যতম ভরসা

কেইনের ব্যবসায়িক মডেলের একটি বিশেষ দিক হলো পরিবার ও নিজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরতা।

ভাই চার্লি কেইন তাঁর ব্যবসায়িক ও প্রতিনিধিত্বমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যুক্তরাজ্যের কোম্পানি রেজিস্ট্রিতেও বিভিন্ন কেইন-সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানে পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে।

ফলে বাণিজ্যিক চুক্তি, বিনিয়োগ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগের ক্ষেত্রে কেইনের নিজস্ব একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে।

এটি অনেকটা ফুটবল মাঠের কৌশলের মতোই—সব সিদ্ধান্ত অন্যের হাতে ছেড়ে না দিয়ে নিজের টিম তৈরি করে এগোনো।

টটেনহামের ‘ট্রফিহীন’ কেইন থেকে ব্যালন ডি’অরজয়ী কেইন

কেইনের ক্যারিয়ারকে বুঝতে হলে এই পরিবর্তনটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

টটেনহামে থাকাকালে গোল, গোল্ডেন বুট, রেকর্ড—সবই ছিল। কিন্তু বড় দলীয় ট্রফি ছিল না। সেই কারণে ‘দুর্দান্ত গোলস্কোরার, কিন্তু ট্রফি নেই’—এমন একটি তকমাও জুটেছিল তাঁর।

বায়ার্নে যাওয়ার পর সেই গল্প বদলে গেছে।

২০২৫–২৬ মৌসুমে ৭৩ গোল, বুন্দেসলিগা, ডিএফবি-পোকাল, সুপারকাপ এবং শেষ পর্যন্ত ব্যালন ডি’অর—এক মৌসুমেই কেইনের ক্যারিয়ারের গল্প যেন নতুন অধ্যায়ে ঢুকে গেছে।

আর মাঠের বাইরেও তিনি ধীরে ধীরে তৈরি করেছেন বিনিয়োগ, সম্পত্তি, প্রযুক্তি, খাবার, স্পোর্টসওয়্যার ও টিকিটিং ব্যবসার একটি বৈচিত্র্যময় জগৎ।

ফুটবলে তাঁর কাজ গোল করা। কিন্তু ক্যারিয়ারের বাইরের জীবনের জন্য তিনি যে প্রস্তুতি নিয়েছেন, সেখানে লক্ষ্যটা আরও দীর্ঘমেয়াদি—ফুটবল শেষ হওয়ার পরও যেন কেইনের নামের সঙ্গে সাফল্যের গল্পটা থেমে না যায়।

Details Bottom
Details ad One
Details Two
Details Three