উইকেটে ঘাস থাকুক বা না থাকুক, বোলারদের আতঙ্কের নাম এখন অভিষেক

উইকেটে ঘাস থাকুক বা না থাকুক, বোলারদের আতঙ্কের নাম এখন অভিষেক
উইকেটে ঘাস থাকুক বা না থাকুক, বোলারদের আতঙ্কের নাম এখন অভিষেক
ভারতীয় ক্রিকেটে প্রজন্ম বদলের সময় চলছে। রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলির মতো মহাতারকারা ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের মধ্যে নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন অভিষেক শর্মা।
মাত্র কয়েক বছর আগেও যাঁকে ‘ফ্ল্যাট ট্র্যাক বুলি’ বলে সমালোচনা করা হতো, সেই অভিষেক এখন ভিন্ন কন্ডিশনেও রান করে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছেন। ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর ৩৮ বলে ১১৩ রানের বিধ্বংসী ইনিংস শুধু ভারতকে জয় এনে দেয়নি, তাঁকে আবারও আইসিসি টি-টোয়েন্টি ব্যাটিং র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ফিরিয়ে দিয়েছে।
৩৮ বলে ১১৩, বোলারদের জন্য দুঃস্বপ্ন
ওয়েলিংটনে অভিষেকের ইনিংসটি ছিল আধুনিক টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংয়ের এক নিখুঁত উদাহরণ। ৩৮ বলে ১১৩ রান করেছেন তিনি, যার মধ্যে ছিল ৯টি চার ও ১১টি ছক্কা। অর্থাৎ বাউন্ডারি থেকেই এসেছে ১০২ রান।
সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতে তাঁর লেগেছে মাত্র ৩৫ বল। তাঁর বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ের সঙ্গে বৈভব সূর্যবংশীর ৪৫ রানের ইনিংস মিলিয়ে ভারতের দুই ওপেনার পাওয়ারপ্লেতেই তুলেছিলেন ১১৮ রান—পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর টি-টোয়েন্টিতে যা নতুন রেকর্ড। শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৩.২ ওভারেই ১৯৯ রানের লক্ষ্য পেরিয়ে যায় ভারত।
শুধু আগ্রাসন নয়, আছে টেকনিকও
অভিষেকের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য শুধু তাঁর ছক্কা মারার ক্ষমতা নয়। ক্যারিয়ার স্ট্রাইক রেট প্রায় ১৯৬—এমন ভয়ংকর আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের সঙ্গে তাঁর টেকনিক ও বোলারের পরিকল্পনা বুঝে শট খেলার দক্ষতাও তাঁকে আলাদা করে তুলেছে।
পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক সালমান বাটের ভাষায়, অভিষেকের ব্যাটিং অন্ধভাবে আক্রমণাত্মক নয়; বরং এটি হিসাব করে ঝুঁকি নেওয়ার ক্রিকেট। বল ও বোলারের কোণ দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নেন কখন আক্রমণ করবেন।
এই কারণেই অভিষেকের ব্যাটিংকে শুধু ‘স্লগিং’ বলে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
‘নতুন প্রজন্মের সুপারস্টার’
প্রবীণ ক্রিকেট সাংবাদিক শারদা উগ্রার চোখে অভিষেক ইতিমধ্যেই ভারতের নতুন ক্রিকেট আইডলদের একজন।
এএফপিকে তিনি বলেছেন, বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ধারাবাহিকতাও অভিষেককে আলাদা করে তুলেছে। তাঁর মতে, ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন প্রজন্মের এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান ইতিমধ্যেই বড় তারকা হয়ে উঠেছেন।
উগ্রার বক্তব্যে আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে। বৈভব সূর্যবংশীকে যখন ভারতের পরবর্তী বড় তারকা হিসেবে অনেকে দেখছিলেন, তখন অভিষেক নিজের ব্যাটিংয়ের আলাদা একটি ধরন তৈরি করে সেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন।
‘শুধু নির্দিষ্ট উইকেটে পারে’—সমালোচকদের জবাব
অভিষেকের ক্যারিয়ারের শুরুতে একটি সমালোচনা প্রায়ই শোনা যেত—ফ্ল্যাট উইকেট ছাড়া নাকি তাঁর ব্যাটিং কার্যকর নয়।
কিন্তু ভিন্ন ভেন্যু ও কন্ডিশনে ধারাবাহিক রান করে সেই ধারণাকে বদলে দিচ্ছেন তিনি। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ওয়েলিংটনের মতো কন্ডিশনে ৩৫ বলে সেঞ্চুরি সেই দাবির অন্যতম বড় জবাব।
ভারতের সাবেক ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ কাইফও তাই এমন সমালোচনা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, অভিষেককে নির্দিষ্ট ধরনের উইকেটের ব্যাটসম্যান হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। তিনি অভিষেককে ওয়ানডেতেও সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
যুবরাজ সিংয়ের হাতে তৈরি আগ্রাসী ব্যাটিং
অভিষেকের ক্রিকেটীয় উত্থানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের সাবেক অলরাউন্ডার যুবরাজ সিংয়ের নাম।
কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় যুবরাজের তত্ত্বাবধানে ব্যাটিং নিয়ে কাজ করেছেন অভিষেক। দুজনই বাঁহাতি, দুজনের ব্যাটিংয়েই আক্রমণাত্মক মানসিকতা—তাই অভিষেকের ব্যাটিংয়ে যুবরাজের ছায়া খুঁজে পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
ওয়েলিংটনের সেঞ্চুরির পরও শিষ্যকে অভিনন্দন জানিয়েছেন যুবরাজ। মজার ছলে নিজের ২০০৭ সালের ১২ বলে ফিফটির প্রসঙ্গ টেনে অভিষেককে খোঁচাও দিয়েছেন তিনি।
ড্যারিল মিচেলের চোখেও ‘বিশ্বমানের’
অভিষেকের ওয়েলিংটন ইনিংস দেখে মুগ্ধ হয়েছেন নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যান ড্যারিল মিচেলও।
ম্যাচের পর তিনি অভিষেকের কয়েকটি শটকে বিশ্বমানের বলে প্রশংসা করেন। মিচেলের মতে, এমন ব্যাটিং দেখলে প্রতিপক্ষ হিসেবেও সম্মান জানাতেই হয়।
আইপিএল থেকে ভারতের নতুন ব্যাটিং তারকা
অভিষেকের উত্থানের ভিত্তি তৈরি হয়েছে ঘরোয়া ক্রিকেট ও আইপিএলে। ২০১৮ সালে রাহুল দ্রাবিড়ের অধীনে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য ছিলেন তিনি।
আইপিএলে শুরুতে দিল্লি ক্যাপিটালসের হয়ে খেললেও সানরাইজার্স হায়দরাবাদেই নিজের ব্যাটিংয়ের পূর্ণ বিকাশ ঘটান অভিষেক। অস্ট্রেলিয়ার ট্রাভিস হেডের সঙ্গে তাঁর ওপেনিং জুটি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অন্যতম আলোচিত জুটি হয়ে ওঠে।
দুজনের আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের কারণে অনেক ম্যাচেই পাওয়ারপ্লের ছয় ওভারেই প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ইতিমধ্যেই চার সেঞ্চুরি
বর্তমানে ৭১টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অভিষেকের রান ২,২৬৭। চারটি সেঞ্চুরির পাশাপাশি তাঁর ব্যাটিং গড় ৩৩.৩৩।
ওয়েলিংটনের সেঞ্চুরিটি ছিল তাঁর টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের চতুর্থ শতক। সব ধরনের টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সেঞ্চুরির সংখ্যায়ও তিনি বিরাট কোহলিকে ছাড়িয়ে গেছেন।
তবে এখনো ওয়ানডে বা টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হয়নি তাঁর।
প্রতিযোগিতা কঠিন, কিন্তু অভিষেকও প্রস্তুত
ভারতের টপ অর্ডারে জায়গা পাওয়া সহজ নয়। সঞ্জু স্যামসন, বৈভব সূর্যবংশীসহ একাধিক ক্রিকেটার জাতীয় দলের জায়গার জন্য লড়াই করছেন।
তবে অভিষেকের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স তাঁকে সেই প্রতিযোগিতায় আলাদা অবস্থানে নিয়ে গেছে। ২৬ বছর বয়সী এই বাঁহাতি এখন শুধু ভারতের ভবিষ্যৎ নন—টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের বর্তমানেরও অন্যতম আলোচিত ব্যাটসম্যান।
দরজায় কড়া নয়, দরজাই ভেঙে ঢুকেছেন
ভারতীয় ক্রিকেটে এক প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্মের তারকা আসা নতুন কিছু নয়। সুনীল গাভাস্কার, শচীন টেন্ডুলকার, বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা—প্রত্যেকেই নিজেদের সময়ে সেই শূন্যতা পূরণ করেছেন।
অভিষেক শর্মার গল্পটা একটু আলাদা।
তিনি দরজায় কড়া নাড়ছেন না। ব্যাট হাতে এমন শব্দে আঘাত করছেন, যেন দরজাটাই ভেঙে ফেলেছেন।
আর উইকেটে ঘাস থাকুক কিংবা না থাকুক—বোলারদের কাছে তাঁর বাঁহাত এখন যে সত্যিই আতঙ্কের নাম, ওয়েলিংটনের ৩৮ বলে ১১৩ তারই আরেকটি বড় প্রমাণ।













