Image

মাসে ৩৫ টাকা আয় থেকে কৃষকের পাশে—নানা পাটেকরের জীবনের অন্য গল্প

৯৭ প্রতিবেদক:

প্রকাশ : 1 ঘন্টা আগেআপডেট: 7 মিনিট আগে
মাসে ৩৫ টাকা আয় থেকে কৃষকের পাশে—নানা পাটেকরের জীবনের অন্য গল্প

মাসে ৩৫ টাকা আয় থেকে কৃষকের পাশে—নানা পাটেকরের জীবনের অন্য গল্প

মাসে ৩৫ টাকা আয় থেকে কৃষকের পাশে—নানা পাটেকরের জীবনের অন্য গল্প

মাত্র ৩৫ টাকা মাসিক আয়। সঙ্গে দিনে একবেলা খাবার। জীবিকার তাগিদে ১৩ বছর বয়সেই সিনেমার পোস্টার আঁকতেন। কলেজে পড়ার সময় রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং এঁকেও উপার্জন করেছেন। সেই কিশোরই একদিন হয়ে ওঠেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা।

খ্যাতি, অর্থ, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার—সবই পেয়েছেন নানা পাটেকর। কিন্তু ভুলে যাননি অভাবের দিনগুলো। বরং নিজের জীবনের সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল অসহায় কৃষক ও তাঁদের পরিবারের পাশে। পর্দার বাইরেও গড়ে উঠেছিল তাঁর আরেকটি পরিচয়—মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক অভিনেতার।

৮ অক্টোবর ৭৫ বছর বয়সে মারা গেলেন নানা পাটেকর। গোয়ার বাসভবনে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর অভিনয়জীবনের পাশাপাশি নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর দীর্ঘদিনের মানবিক কাজ।

৩৫ টাকা আর একবেলা খাবারে শুরু

শৈশব থেকেই অভাবের সঙ্গে পরিচয় নানা পাটেকরের। রিডার্স ডাইজেস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, মাত্র ১৩ বছর বয়সে মাসে ৩৫ টাকা এবং একবেলা খাবারের বিনিময়ে সিনেমার পোস্টার আঁকতেন।

কলেজে পড়ার সময়ও উপার্জনের পথ খুঁজতে হয়েছে তাঁকে। রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং এঁকে পেতেন ১৫ টাকা।

জীবনের সেই কঠিন অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর প্রভাব ফেলে। নানা বলেছিলেন, বঞ্চিত মানুষের কষ্টের সঙ্গে তিনি সহজেই একাত্ম হতে পারেন। অন্যের যন্ত্রণাকে তাঁর নিজের যন্ত্রণা বলেই মনে হয়।

অভিনয়ে সাফল্য, জীবনযাপনে সরলতা

অভাবের দিন পেরিয়ে অভিনয়ে প্রতিষ্ঠা পান নানা পাটেকর।‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘অব তক ছাপ্পান’, ‘ওয়েলকাম’—বিভিন্ন ছবিতে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরেছেন তিনি।

কখনো কঠোর পুলিশ কর্মকর্তা, কখনো প্রতিবাদী মানুষ, আবার কখনো হাস্যরসের চরিত্র—সব ভূমিকাতেই ছিল তাঁর স্বতন্ত্র উপস্থিতি। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, সংলাপ বলার আলাদা ধরন এবং অভিনয়ের তীব্রতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

তবে সাফল্য তাঁকে জীবনযাপনে খুব একটা বদলায়নি। সাধারণ অ্যাপার্টমেন্টে থাকা, গ্রামের বাড়িতে সময় কাটানো—এসবই ছিল তাঁর পছন্দ। দামি পোশাক, বিলাসবহুল বাড়ি কিংবা তারকাসুলভ জাঁকজমকের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল না।

২০১৫ সালের এক সাক্ষাৎকারে নানা বলেছিলেন, তাঁর চাহিদা খুব সীমিত। এক কোটি রুপি দিয়ে দামি গাড়ি কেনার চেয়ে সেই অর্থ কোনো কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে ব্যয় করাই তাঁর কাছে বেশি অর্থবহ।

কৃষকের দুর্দশা নাড়া দিয়েছিল তাঁকে

২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ খরা দেখা দেয়। ফসলহানি, ঋণের বোঝা ও আর্থিক সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন বহু কৃষক। একই সময়ে কৃষকদের আত্মহত্যার ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে সামনে আসছিল।

ঘটনাগুলো গভীরভাবে নাড়া দেয় নানা পাটেকরকে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের কাছে যেতে শুরু করেন।

বিদর্ভ অঞ্চলে আত্মহত্যা করা কৃষকদের ৬২টি পরিবারকে ১৫ হাজার রুপি করে সহায়তা দেন তিনি। পরে লাতুর ও ওসমানাবাদ অঞ্চলের আরও ১১৩টি পরিবারকে একইভাবে অর্থসহায়তা করেন।

তবে পরিবারগুলোর সঙ্গে সরাসরি দেখা করে নানা বুঝতে পারেন, এককালীন অর্থ দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।

সেখান থেকেই ‘নাম ফাউন্ডেশন’

এই উপলব্ধি থেকেই মারাঠি অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে‘নাম ফাউন্ডেশন’প্রতিষ্ঠা করেন নানা পাটেকর।

প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, খরাপীড়িত কৃষকদের সহায়তা, পানি সংরক্ষণ, জলাধার পুনরুদ্ধার এবং গ্রামীণ উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করে সংগঠনটি। কৃষকদের আত্মহত্যা ও আর্থিক সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খোঁজাও ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য।

২০১৬ সালে গভর্ন্যান্স নাউকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নানা জানিয়েছিলেন, টেলিভিশনে এক কৃষকের আত্মহত্যার পর তাঁর পরিবারের দুর্দশা দেখে তিনি প্রথমে নিজের জমানো অর্থ থেকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে গিয়ে তাঁর মনে হয়, তাঁদের পাশে দীর্ঘদিন থাকতে হবে।

সেই ভাবনা থেকেই ব্যক্তিগত সহায়তার পরিধি বড় করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেন তিনি।

শুধু টাকা নয়, মানসিক সমর্থনও

২০১৮ সালে টাইমস অব ইন্ডিয়াকে নানা বলেছিলেন, কৃষকদের শুধু অর্থ দিলেই হবে না; তাঁদের মানসিক ও সামাজিক সমর্থনও প্রয়োজন। বিপদের সময়ে তাঁরা যেন মনে না করেন যে তাঁরা একা—এই ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ।

এই দর্শন থেকেই নাম ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি পানি, জীবিকা ও গ্রামীণ উন্নয়নের মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের দিকে বিস্তৃত হয়।

নবভারত টাইমসের ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নাম ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মহারাষ্ট্রে ২ হাজার ৬৪১ জনের বেশি কৃষকের বিধবা স্ত্রী আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। কারও ঘর নির্মাণে সহায়তা করা হয়েছে, আবার কাউকে জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে।

ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত ২০১৫–২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ে মহারাষ্ট্রে ২ হাজার ২৪৬টি পানির উৎস পুনরুদ্ধার এবং ১৭৮টি নদী পুনরুজ্জীবনের কাজ হয়েছে। এসব উদ্যোগে ৭৭ লাখের বেশি কৃষক উপকৃত হয়েছেন বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

মৃত্যুর আগের বছরেও ছিলেন কাজের সঙ্গে

নানা পাটেকর ২০২৬ সালেও নাম ফাউন্ডেশনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মে মাসে নাগপুরে পানি সংরক্ষণবিষয়ক এক অনুষ্ঠানে সংগঠনটির সভাপতি হিসেবে অংশ নেন তিনি।

সেখানে তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল—পানি সংরক্ষণের কাজ মানুষের ভেতর থেকে আসতে হবে, শুধু লোকদেখানোর জন্য নয়।

এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মহারাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে নাম ফাউন্ডেশনের নতুন উন্নয়ন সহযোগিতার খবরও প্রকাশিত হয়। গড়চিরোলি অঞ্চলে পানি সংরক্ষণ, নদী খনন ও গ্রামীণ জীবিকার উন্নয়ন ছিল সেই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

প্রচার নয়, মানুষের পাশে থাকাই আনন্দ

নিজের দাতব্য কাজ নিয়ে প্রচার করতে পছন্দ করতেন না নানা পাটেকর।

রিডার্স ডাইজেস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মানুষের জন্য এত কাজ করেন, অথচ তা নিয়ে প্রচার করেন না কেন?

নানার উত্তর ছিল, অন্যরা দীপাবলিতে আতশবাজি ফোটান, মিষ্টি কেনেন। তাঁর কাছে অসহায় মানুষকে সাহায্য করাই দীপাবলির আনন্দ। অন্যের জন্য কাজ করেই তিনি আনন্দ পান।

এই দর্শনই হয়তো তাঁর জীবনকে অভিনেতার পরিচয়ের বাইরে আরও বড় করে তুলেছিল।

৩৫ টাকার কিশোর থেকে মানুষের ভরসা

দর্শকের কাছে নানা পাটেকর হয়তো‘ক্রান্তিবীর’-এর প্রতিবাদী কণ্ঠ,‘পরিন্দা’-র দাপুটে অভিনেতা কিংবা‘ওয়েলকাম’-এর হাস্যরসের চরিত্র।

কিন্তু মহারাষ্ট্রের বহু কৃষক পরিবারের কাছে তিনি ছিলেন অন্যরকম একজন মানুষ—বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানো একজন সহায়।

একদিন মাসে ৩৫ টাকা ও একবেলা খাবারের বিনিময়ে সিনেমার পোস্টার আঁকা সেই কিশোর পরবর্তী জীবনে নিজের অর্থ, সময় ও শ্রম ব্যয় করেছেন অসহায় মানুষের জন্য।

তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, পদ্মশ্রীসহ অসংখ্য অর্জন নিয়ে নানা পাটেকর বিদায় নিলেন। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো কোনো পুরস্কার বা চরিত্র নয়—মানুষের জন্য কিছু করে যাওয়ার চেষ্টা।

১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে জন্ম নানা পাটেকরের। তাঁর প্রকৃত নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে কয়েক দশকের অভিনয়জীবনে স্বতন্ত্র অভিনয়ভঙ্গি ও সংলাপ বলার ধরনের জন্য বিশেষ পরিচিতি পান তিনি।

‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অব তক ছাপ্পান’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘ওয়েলকাম’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন নানা পাটেকর। তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মাননায় ভূষিত করে।

 
Details Bottom
Details ad One
Details Two
Details Three