পেটে খাবার ছিল না, পায়ে জুতা ছিল না—সেই ছেলে আজ রিয়াল মাদ্রিদের তারকা
- 1
উইকেটে ঘাস থাকুক বা না থাকুক, বোলারদের আতঙ্কের নাম এখন অভিষেক
- 2
এমন হারের দায় কি শুধুই নাজমুল–লিটনদের?
- 3
৩২৬ রান তাড়া, ৯ বছর পর ট্রফি—পাকিস্তানের যত রেকর্ড
- 4
‘জম্বির মতো ডাইভ দিতাম, প্রতি রাতে কাঁদতাম’: আঙুল ভেঙেও যেভাবে আর্জেন্টিনার জন্য লড়েছিলেন মার্তিনেজ
- 5
মেসির দুর্দান্ত গোলে জয় ইন্টার মায়ামির, হেডে অ্যাসিস্টও করলেন

পেটে খাবার ছিল না, পায়ে জুতা ছিল না—সেই ছেলে আজ রিয়াল মাদ্রিদের তারকা
পেটে খাবার ছিল না, পায়ে জুতা ছিল না—সেই ছেলে আজ রিয়াল মাদ্রিদের তারকা
আইভরিকোস্টের আবিদজানের সিকোজি মহল্লা। চারপাশে দারিদ্র্য, ভিড় আর ব্যস্ত রাস্তা। সেখানে শিশুদের ফুটবল মানে কখনো পুরোনো কাপড় পেঁচিয়ে বানানো বল, কখনো ছেঁড়া মোজা, কখনো প্লাস্টিকের বল। পায়ে জুতা থাকা ছিল বিলাসিতা। অনেক সময় খালি পায়েই ফুটবল খেলতে হতো।
সেই শিশুদেরই একজন ছিলেন ইয়ান দিওমান্দে।
আজ সেই ছেলেটিই রিয়াল মাদ্রিদের তারকা। ১৯ বছর বয়সে রিয়াল তাঁকে RB Leipzig থেকে নিয়েছে €১২৫ মিলিয়ন ফিক্সড ট্রান্সফার ফিতে, সঙ্গে আরও €১৫ মিলিয়ন পর্যন্ত বোনাসের সুযোগ। রিয়ালের ইতিহাসে গ্যারান্টিড ফি হিসেবে এটিই সবচেয়ে বড় ট্রান্সফার।
কিন্তু দিওমান্দের গল্পটা শুরু হয়েছিল একেবারেই অন্য জায়গা থেকে।
তিন বেলা খাবারই ছিল স্বপ্ন
দিওমান্দে বড় হয়েছেন মা ও বোন রোকসানের সঙ্গে। কাজের সন্ধানে তাঁর বাবা চলে গিয়েছিলেন ফ্রান্সে। সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। আনন্দের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল ফুটবল।
ছোটবেলাতেই তাঁর ড্রিবলিং আর শট নজর কাড়ত। পাড়ার লোকজন তাই তাঁকে ডাকত ‘রবার্তো কার্লোস’ নামে—ব্রাজিলের কিংবদন্তি বাঁ পায়ের ডিফেন্ডারের নাম অনুসারে।
একদিন রাস্তার ফুটবলেই বদলে যায় তাঁর জীবন।
ব্যবসায়ী ও ফুটবল প্রতিভা অন্বেষক দেজ বাম্বার চোখে পড়েন দিওমান্দে। বাম্বা তাঁকে নিয়ে যান নিজের প্রতিষ্ঠিত AFI Sud Comoé একাডেমিতে। ২০১৪ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে সেখানে পৌঁছান দিওমান্দে।
একাডেমিতে ছিলেন আরও প্রায় ৪০ জন প্রতিভাবান শিশু। অনেকের জন্য সেটিই ছিল প্রথম নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার সুযোগ। আর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন—দিনে তিন বেলা, কখনো চার বেলা খাবার।
একাডেমির সাবেক কোচ হোসে হুলিয়ান লোপেস পরে স্মৃতিচারণা করে জানান, শিশুদের কাছে প্রতিদিন খাবার পাওয়াটাই ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দ।
ছোট বয়সেই আলাদা করে দিয়েছিল প্রতিভা
দিওমান্দে তখন বয়সে বড় ছেলেদের বিপক্ষেও ভয় পেতেন না। একাডেমির নিয়মিত লিগ না থাকায় বিভিন্ন দলের সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ খেলতে হতো। মূলত ডান উইংয়ে খেলতেন তিনি; পরে বাঁ উইংয়েও দেখা যায় তাঁকে।
আফ্রিকান ট্যালেন্ট এলিট একাডেমির পরিচালক ফ্রান কাস্তানিয়ো প্রথম তাঁকে দেখেন অনূর্ধ্ব-১৭ আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের বাছাইপর্বে। বয়স তখন মাত্র ১৫।
কাস্তানিয়োর চোখে তখনই পরিষ্কার হয়ে যায়—এই ছেলেটি অন্যদের মতো নয়। দুই উইংয়ে খেলতে পারতেন, গতি ছিল, শক্তি ছিল, ড্রিবলিং ছিল, গোল করার ক্ষমতাও ছিল।
লোপেসেরও প্রায় একই অভিজ্ঞতা। বল পায়ে দিওমান্দেকে দেখেই বুঝেছিলেন, সামনে বড় কিছু অপেক্ষা করছে। এতটাই এগিয়ে ছিলেন যে বয়সভিত্তিক দলে তাঁকে অনূর্ধ্ব-১২ থেকে সরাসরি অনূর্ধ্ব-১৪ দলে তুলে দেওয়া হয়।
সমস্যা ছিল—বল পেলে থামতেন না
প্রতিভার সঙ্গে ছিল এক শিশুসুলভ অস্থিরতা।
নিজেদের গোলপোস্টের কাছ থেকে বল নিয়ে পাঁচ-ছয়জন বড় খেলোয়াড়কে কাটিয়ে প্রতিপক্ষের গোলপোস্ট পর্যন্ত ছুটে যেতেন দিওমান্দে। কখনো গোল করতেন, কখনো মাঝপথে বল হারাতেন।
তাই লোপেসের প্রথম কাজ ছিল তাঁকে থামতে শেখানো।
কখন ড্রিবল করতে হবে, কখন পাস দিতে হবে, কখন গতি কমাতে হবে—এসব বোঝানো শুরু হয়। দিওমান্দে শুধু দ্রুত শিখতেনই না, প্রতিটি নির্দেশের পেছনের কারণও জানতে চাইতেন।
মাঠের মতো পড়াশোনাতেও ছিলেন মেধাবী। একাডেমিতে আসা অনেক শিশুই পড়তে বা লিখতে জানত না। দিওমান্দে সেখানে দুই জায়গাতেই দ্রুত এগিয়ে যান।
প্রথম বুটজোড়া, তারপর যেন উড়তে শুরু
লোপেসের ভাষায়, দিওমান্দের ড্রিবলিং ও শুটিং ছিল প্রায় জন্মগত প্রতিভা। একাডেমি তাঁকে প্রথম ফুটবল বুটজোড়া দেওয়ার পর তাঁর উন্নতি আরও দ্রুত হয়।
সতীর্থদের অনেকের শট গোলপোস্ট পর্যন্ত পৌঁছাত না, আর দিওমান্দে দূর থেকেও জোরালো শট নিতে পারতেন। এমনকি কর্নার নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর আলাদা দক্ষতা ছিল।
কিন্তু ইউরোপের দরজা তখনও বন্ধ।
১৮ বছরের আগে আন্তর্জাতিক ট্রান্সফারের কঠোর নিয়মের কারণে ইউরোপে গিয়ে পেশাদার ফুটবল শুরু করা সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যান তিনি। সেখানে স্কুল ফুটবল খেলেন, বিভিন্ন পর্যায়ে নিজেকে প্রমাণ করেন এবং MLS ক্লাবগুলোর ট্রায়ালও দেন।
এরপর আসে স্পেন।
২০২৪ সালের শেষ দিকে লেগানেসে যোগ দেন দিওমান্দে। ২০২৫ সালে RB Leipzig তাঁকে প্রায় €২০ মিলিয়নে কিনে নেয়। জার্মানিতে মাত্র এক মৌসুমেই তাঁর উত্থান এত দ্রুত হয় যে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজর পড়ে তাঁর ওপর।
লাইপজিগ থেকে সরাসরি রিয়াল মাদ্রিদ
লাইপজিগের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে দিওমান্দেকে পাওয়ার দৌড়ে নামে ইউরোপের একাধিক ক্লাব।
শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় রিয়াল মাদ্রিদ।
€১২৫ মিলিয়ন ফিক্সড ফি এবং আরও €১৫ মিলিয়ন পর্যন্ত ভেরিয়েবলসহ সাত বছরের চুক্তিতে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে পা রাখেন দিওমান্দে।
মাত্র এক বছর আগে যে খেলোয়াড়কে প্রায় €২০ মিলিয়নে কিনেছিল লাইপজিগ, তাঁকেই ছয় গুণের বেশি দামে বিক্রি করল জার্মান ক্লাবটি।
আর দিওমান্দের জন্য সেটি ছিল এক অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন—শৈশবের দারিদ্র্য থেকে ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে।
এখন রিয়ালের সাদা জার্সিতে
রিয়াল মাদ্রিদে শুরুটাও দ্রুত জমিয়ে নিয়েছেন দিওমান্দে।
ক্লাবের অফিসিয়াল পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ মৌসুমে এখন পর্যন্ত ১৪ ম্যাচে ৭৩৯ মিনিট খেলেছেন তিনি। করেছেন ৪ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট। লা লিগায় ১১ ম্যাচে ৩ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট তাঁর।
অর্থাৎ, যে ছেলেটা একসময় খালি পায়ে রাস্তায় ফুটবল খেলতেন, এখন সেই পা দিয়েই রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে গোল করছেন, অ্যাসিস্ট করছেন, আর ইউরোপের সেরা ক্লাবগুলোর বিপক্ষে নিজের সামর্থ্য দেখাচ্ছেন।
বোন রোকসানকে ভুলে যাননি
দিওমান্দের গল্পের সবচেয়ে আবেগের জায়গাগুলোর একটি তাঁর বোন রোকসান।
শৈশবে রোকসান ছিলেন তাঁর বড় অনুপ্রেরণা। আফ্রিকার ‘ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো’ হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন দিওমান্দে—আর সেই স্বপ্নকে আরও বড় করে দেখতে উৎসাহ দিতেন তাঁর বোন।
কিন্তু সেই বোন আজ আর নেই।
তাই খ্যাতির শীর্ষে উঠেও নিজের শিকড় ভুলে যাননি দিওমান্দে। পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার পাশাপাশি নিজের পুরোনো মহল্লার মানুষদেরও সহায়তা করেন। যে সিকোজির রাস্তায় একদিন ন্যাকড়ার বল নিয়ে ছুটতেন, সেখানকার মানুষ এখন তাঁকে নিয়ে গর্ব করে।
একটি একাডেমি থেকে ইউরোপের মঞ্চে
AFI একাডেমির আরও অনেক খেলোয়াড় পেশাদার ফুটবলে পৌঁছেছেন। ১১ জন এখন ইউরোপে খেলেন, আর ২০ জনের বেশি আইভরিকোস্টের শীর্ষ বিভাগে খেলছেন বলে একাডেমির সাবেক কোচ লোপেস জানিয়েছেন। কিন্তু দিওমান্দের গল্প তাঁর কাছে আলাদা।
কারণ তাঁর যাত্রাটা শুধু একজন ফুটবলারের সাফল্যের গল্প নয়।
এটি এমন এক শিশুর গল্প, যার কাছে তিন বেলা খাবার ছিল স্বপ্ন। যার পায়ে ফুটবল বুট ছিল না। যার বল কখনো বানানো হতো পুরোনো কাপড় দিয়ে।
আজ সেই ছেলেটিই রিয়াল মাদ্রিদের খেলোয়াড়।
আইভরিকোস্টে তাঁর উত্থান নিয়ে তাই নতুন উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। দেশটির মানুষ তাঁকে এখন দিদিয়ের দ্রগবা ও ইয়াইয়া তোরের মতো কিংবদন্তিদের পাশে দেখতে শুরু করেছেন।
ফুটবল কখনো কখনো শুধু জীবন বদলায় না। কখনো কখনো ফুটবল একটি শিশুকে এমন এক ঠিকানায় পৌঁছে দেয়, যা একসময় তার কাছে ছিল নিছক স্বপ্ন।
ইয়ান দিওমান্দের গল্প ঠিক তেমনই—খালি পা থেকে রিয়াল মাদ্রিদের সাদা জার্সি।












