ইরানে পারমাণবিক বোমা নয়, তাহলে কী হামলা চালাতে পারেন ট্রাম্প?

ইরানে পারমাণবিক বোমা নয়, তাহলে কী হামলা চালাতে পারেন ট্রাম্প?
ইরানে পারমাণবিক বোমা নয়, তাহলে কী হামলা চালাতে পারেন ট্রাম্প?
ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এবার একটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন তিনি—ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন না। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অপারমাণবিক বোমাগুলোর একটি ‘মাদার অব অল বম্বস’ বা **MOAB** ব্যবহারের সম্ভাবনাও সরাসরি নাকচ করেননি ট্রাম্প।
নিউজম্যাক্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালাতে পারে। বিশেষ করে **পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন (Pickaxe Mountain)**-কে লক্ষ্যবস্তু করার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর দাবি, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার একটি অংশ পাহাড়ের গভীরে সুরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করব না। আমাদের তা করার প্রয়োজন নেই। আমরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক শক্তিধর দেশ।’
তবে মার্কিন প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক ও প্রতিরক্ষা স্থাপনায় বড় ধরনের নতুন হামলার পরিকল্পনা করছে—এমন প্রতিবেদনের বিষয়ে ট্রাম্প পুরোপুরি অস্বীকৃতি জানাননি। বরং তিনি স্পষ্ট করেছেন, **GBU-43/B Massive Ordnance Air Blast**, সংক্ষেপে MOAB, কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নয়।
ট্রাম্প কী বলেছেন?
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি যাতে আবার সক্রিয় হতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য। এ কারণে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের মতো গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আবার হামলার প্রয়োজন হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত একটি গভীর ভূগর্ভস্থ সুরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি MOAB ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি।
ট্রাম্প আরও বলেছেন, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র গেলে সেটি ব্যবহার করার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এখনই সংঘাত শেষ করার অবস্থায় নেই।
তবে তিনি ইরানে মার্কিন স্থলবাহিনী পাঠানোর পরিকল্পনাও নাকচ করেছেন।
‘মাদার অব অল বম্বস’ বা MOAB আসলে কী?
**MOAB-এর পূর্ণ নাম GBU-43/B Massive Ordnance Air Blast।** এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রচলিত বা অপারমাণবিক বোমাগুলোর একটি। নামের মধ্যে ‘Mother of All Bombs’ থাকলেও এটি পারমাণবিক বোমা নয়।
এই বোমায় প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কেজি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক থাকে এবং এর মোট ওজন প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কেজি। দৈর্ঘ্য ৯ মিটারের বেশি। এত বড় হওয়ায় এটি সাধারণ যুদ্ধবিমান দিয়ে বহন করা যায় না; এর জন্য বড় পরিবহন বিমান প্রয়োজন হয়।
MOAB মূলত মাটির খুব কাছাকাছি বিস্ফোরণের মাধ্যমে ব্যাপক বিস্ফোরণ-তরঙ্গ তৈরি করার জন্য তৈরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্মুক্ত স্থানে থাকা সেনা, সরঞ্জাম ও বিভিন্ন স্থাপনায় এটি ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে। পরীক্ষার সময় এর বিস্ফোরণে তৈরি মাশরুম আকৃতির মেঘ বহু দূর থেকেও দেখা গিয়েছিল।
তবে ইরানের গভীর ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনার বিরুদ্ধে MOAB কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ এটি মূলত ভূপৃষ্ঠে ব্যাপক বিস্ফোরণ ঘটানোর অস্ত্র; পাহাড়ের গভীরে থাকা শক্তিশালীভাবে সুরক্ষিত স্থাপনা ধ্বংসের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে।
পারমাণবিক বোমা ও MOAB-এর পার্থক্য
পারমাণবিক অস্ত্রের মতো MOAB কোনো পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটায় না। পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা আসে নিউক্লিয়ার ফিশন বা ফিউশন থেকে, যার ফলে বিস্ফোরণের পাশাপাশি তেজস্ক্রিয়তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে MOAB একটি প্রচলিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক অস্ত্র। তাই ট্রাম্প যখন বলেন, ‘মাদার অব অল বম্বস’ পারমাণবিক নয়, সেটি প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক।
তবে ‘অপারমাণবিক’ মানেই যে এটি কম বিধ্বংসী, তা নয়। MOAB-এর বিস্ফোরণ ব্যাপক এলাকাজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে সক্ষম।
কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র কী?
‘কৌশলগত’ বা **tactical nuclear weapon** বলতে তুলনামূলক কম বিস্ফোরণ ক্ষমতার পারমাণবিক অস্ত্রকে বোঝানো হয়, যা বড় পরিসরের ধ্বংসযজ্ঞের বদলে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য তৈরি।
তবে এগুলোকে ‘ছোট’ পারমাণবিক অস্ত্র ভাবার সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছেন, এ ধরনের অস্ত্রও ভয়াবহ মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।
ট্রাম্প এবার স্পষ্টভাবেই বলেছেন, ইরানে তিনি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন না। ফলে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী সম্ভাব্য পরবর্তী হামলা হলে সেটি পারমাণবিক হামলা নয়, বরং প্রচলিত অস্ত্রের মাধ্যমেই হওয়ার কথা।
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন এমনই একটি সুরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো পাহাড়ের গভীরে অবস্থান করছে এবং প্রয়োজনে সেখানে হামলা চালানো হতে পারে। তাঁর বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে এই স্থাপনা।
তবে গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংস করা সামরিকভাবে অত্যন্ত কঠিন। ফলে শুধু বড় বিস্ফোরক ব্যবহার করলেই এমন স্থাপনা পুরোপুরি অকার্যকর করা যাবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

ট্রাম্প আগে কী বলেছিলেন?
ইরান সংঘাতের শুরু থেকেই ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্যে সামরিক উত্তেজনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এর আগে তিনি ইরানের অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দিয়েছেন এবং দেশটির বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের কথা বলেছেন।
তবে এবারই প্রথম তিনি ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে এত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে তিনি তা করবেন না। একই সঙ্গে তিনি নতুন হামলার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি।
সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে মূল আলোচনা ঘুরছে ইরানের পারমাণবিক ও প্রতিরক্ষা স্থাপনাকে কেন্দ্র করে। ট্রাম্প পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করলেও MOAB ব্যবহারের সম্ভাবনা খোলা রেখেছেন এবং পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তবে এখন পর্যন্ত MOAB ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। তাই সম্ভাব্য হামলা নিয়ে আলোচনা থাকলেও সেটিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার—**ইরানে পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের পরিকল্পনা তিনি নাকচ করেছেন, কিন্তু ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বড় ধরনের নতুন প্রচলিত হামলার সম্ভাবনা এখনো উড়িয়ে দেননি।** আর সেই সম্ভাব্য হামলায় সবচেয়ে আলোচিত অস্ত্র হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের MOAB বা ‘মাদার অব অল বম্বস’।















